শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী (পাঠ ২)

আদর্শ জীবনচরিত - হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

226

পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা। এর অন্তর্গত বারাসাত মহকুমার একটি গ্রাম চাকলা। এ গ্রামেই ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে লোকনাথের জন্ম। পিতা রামকানাই চক্রবর্তী এবং মাতা কমলা দেবী।
লোকনাথ ছিলেন তাঁর পিতা-মাতার চতুর্থ পুত্র। রামকানাইর বড়ই ইচ্ছা- তাঁর একটি পুত্র সন্ন্যাস গ্রহণ করুক। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে বংশ পবিত্র করুক।
পিতার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য লোকনাথ এগিয়ে এলেন। তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করবেন। এ-কথা শুনলেন লোকনাথের বন্ধু বেণীমাধব চক্রবর্তী। তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন সন্ন্যাস নেবেন। আচার্য ভগবান গাঙ্গুলী হলেন তাঁদের গুরু। তিনি ছিলেন একজন যোগী পুরুষ। তিনি তাঁদের দীক্ষা দিলেন। তারপর একদিন দুই বালক ব্রহ্মচারীকে নিয়ে তিনি গৃহত্যাগ করলেন।
প্রথমে তাঁরা গেলেন কোলকাতার কালীঘাটে। কালীঘাট তখন সাধন-ভজনের এক পবিত্র অরণ্যভূমি। গুরুর তত্ত্বাবধানে লোকনাথ ও বেণীমাধব কঠোর সাধনায় রত হলেন। এভাবে তাঁদের ২৫ বছর কেটে গেল। তারপর তাঁরা গেলেন কাশীধামে। গুরু ভগবান গাঙ্গুলী তখন বৃদ্ধ। শরীর খুবই দুর্বল। তাই তিনি কাশীধামের পরম সাধক হিতলাল মিশ্রের হাতে লোকনাথ ও বেণীমাধবকে তুলে দিলেন। তারপর গঙ্গার ঘাটে গিয়ে তিনি যোগবলে দেহত্যাগ করেন।
হিতলাল মিশ্র লোকনাথ ও বেণীমাধবকে নিয়ে চলে যান হিমালয়ে। সেখানে দীর্ঘকাল কঠোর সাধনা করে দুজনেই সিদ্ধিলাভ করেন। যোগবিভূতির অধিকারী হন। এরপর তাঁরা দেশ পরিভ্রমণে বের হন। আফগানিস্তান মক্কা, মদিনা, চীন প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করে তাঁরা হিমালয়ে ফিরে আসেন। হিতলাল তখন বলেন, 'আমার সাথে আর তোমাদের থাকার প্রয়োজন নেই। তোমরা নিজভূমিতে যাও। সেখানে তোমাদের কাজ করতে হবে।'
এবার দুই বন্ধুর বিচ্ছিন্ন হবার পালা। বেণীমাধব গেলেন ভারতের কামাখ্যার দিকে। আর লোকনাথ এলেন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। এখান থেকেই লোকনাথের লোকসেবা ও সাধনার নতুন জীবনের শুরু।

দাউদকান্দিতে লোকনাথ একদিন এক বটগাছের নিচে বসে ধ্যান করছেন। এমন সময় ভেঙ্গু কর্মকার নামে এক দরিদ্র লোক এসে তাঁর পা জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, 'বাবা, আমাকে রক্ষা করুন। আমি এক ফৌজদারি মামলায় পড়েছি। রেহাই পাবার উপায় নেই।'

ভেঙ্গুকে দেখে লোকনাথের দয়া হলো। তিনি যে সর্বজীবের মধ্যেই ব্রহ্মকে খুঁজতেন। সর্বজীবের মঙ্গল সাধনই ছিল তাঁর সাধনার লক্ষ্য। তাই তিনি ভেঙ্গুকে অভয় দিয়ে বললেন, 'যা, তুই মুক্তি পাবি।' ভেঙ্গু ঠিকই মুক্তি পেলেন। তাই খুশি হয়ে তিনি লোকনাথকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন। লোকনাথ সেখানে কিছুদিন থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদী গ্রামে চলে গেলেন।

বারদীর জমিদার তখন নাগবাবু। তিনি একবার লোকনাথের কৃপায় মামলায় জয়লাভ করেন। তাই তিনি বারদী গ্রামে লোকনাথের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ক্রমে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় লোকনাথের আশ্রম। দলে- দলে ভক্তরা আসতে থাকেন। লোকনাথের অলৌকিক শক্তির প্রভাবে অনেক রুগ্ন মানুষ সুস্থ হন। অনেকে বিপদ থেকে উদ্ধার পান। পাপী- তাপী মুক্তি লাভ করেন। সাধকেরা সিদ্ধি লাভ করেন। এভাবে লোকনাথ 'বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী' হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দেশ-বিদেশে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
লোকনাথ জাতি, ধর্ম বা বর্ণের বিচার করতেন না। তাঁর কাছে সব মানুষই ছিল সমান। তাঁকে এক গোয়ালিনী দুধ দিতেন। লোকনাথ তাঁকে মা বলে ডাকতেন। লোকনাথের অনুরোধে গোয়ালিনী শেষে আশ্রমেই থাকতেন।

লোকনাথ শুধু মানুষ নয়, জীবজন্তু ও পশুপাখিকেও সমানভাবে ভালোবাসতেন। তাঁর আশ্রমে অনেক পশুপাখি থাকত। তিনি নিজের হাতে তাদের খাবার দিতেন। পাখিরা নির্ভয়ে তাঁর গায়ে এসে বসত। আসলে তিনি সব জীবের মধ্যেই ব্রহ্মের উপস্থিতি উপলব্ধি করতেন। তিনি মনে করতেন, ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ বিকাশ কল্যাণতম রূপে। তিনি বলতেন, 'যত্তে রূপং কল্যাণতমং তৎ তে পশ্যামি।'- আমি তোমার কল্যাণতম রূপই প্রত্যক্ষ করি। তাই জীবের কল্যাণ করে তিনি যে আনন্দ পেতেন, সেটাই ছিল তাঁর ব্রহ্মানন্দ।
বাবা লোকনাথ ছিলেন অশেষ কৃপাবান মহাপুরুষ। তাই তিনি সংসারী লোকদের প্রতি পরম আশ্বাসের বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,

'রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে,
আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।'

এই পরম পুরুষ বাবা লোকনাথ ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে বারদীর আশ্রমে পরলোক গমন করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ১৬০ বছর।

লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবনী থেকে আমরা এই নৈতিক শিক্ষা পাই যে, পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। মানুষ, পশু-পাখি সকল জীবকে ভালোবাসতে হবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ কোনরূপ ভেদাভেদ করা যাবে না। সমাজের উঁচু-নীচু সবাইকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। ব্রহ্মজ্ঞানে জীবের সেবা করতে হবে। সকলের মধ্যে যে আত্মা আছে, তার সঙ্গে নিজের আত্মাকে এক করে দেখতে হবে। তবেই ব্রহ্মলাভ হবে।

একক কাজ: শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর লোকসেবার একটি ঘটনা লিখ

নতুন শব্দ: ব্রহ্মচারী, যোগীপুরুষ, ফৌজদারি, পশ্যামি, ব্রহ্মজ্ঞান।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...